হঠাৎ তীব্র কাশি বা দীর্ঘমেয়াদি কাশি- উভয়ই
অ্যাজমা, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সারের
মতো বিপজ্জনক রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। লিখেছেন
বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকার
বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আবদুস
শাকুর খান
কাশি কী?
ফুসফুসে যে পথে বাতাস প্রবেশ করে তার ওপরের দিকের
নালিতে কোনো কিছু আটকে গেলে বা জমা হলে তা বের
করার স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াই কাশি। কোনো কিছু
জমলে বা আটকে গেলে বাতাস চলাচলের ওই নালির
গাত্রের কোষে প্রদাহ হয় এবং ফুসফুস থেকে হঠাৎ
জোরে বাতাস বের হয়ে ওই স্থানকে পরিষ্কার করতে চায়।
এই কাশি যেমন ইচ্ছা করে গলা পরিষ্কারের জন্য
দেওয়া হয়, আবার ফুসফুসের কিছু
অসুখে তা অনিয়ন্ত্রিতভাবেও হতে পারে।
কাশি কখনো ঘুষঘুষে বা শুকনো হয়, কখনো কাশির সঙ্গে কফ
বের হয়। কাশি হতে পারে ইনফেকশন থেকে। যেমন-
সাইনুসাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, হুপিং কফ,
যক্ষ্মা ইত্যাদি। কাশি কিন্তু ইনফেকশন ছাড়াও
হতে পারে। যেমন- এমফাইসিমা, অ্যাজমা ও
অ্যালার্জিজনিত কাশি।
যেসব অসুখে কাশি হতে পারে
কাশি মূলত শ্বাসযন্ত্রের অসুখ। তাই শ্বাসতন্ত্রের
অসুখ, যেমন- শ্বাসনালির প্রদাহ,
অ্যাজমা বা হাঁপানি, সিওপিডি, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা,
ফুসফুসের ক্যান্সার ইত্যাদিতে উপসর্গ
হিসেবে কাশি থাকে। ভাইরাসজনিত সাধারণ অসুখেও
কাশি হতে পারে ।
আবার সাইনাস ইনফেকশন, কানের অসুখ, গলার
ইনফেকশন থেকেও কাশি হতে পারে।
কাশির উপসর্গ
ইনফেকশন থেকে কাশি হলে সাধারণত জ্বর, শরীর ব্যথা,
গলাব্যথা, বমি ও বমিবমি ভাব, মাথাব্যথা, অনবরত
সর্দি, ঘুমের মধ্যে ঘেমে যাওয়া, কাশির
সঙ্গে বেশি পরিমাণে কফ যাওয়া ইত্যাদি থাকে।
ইনফেকশন ছাড়া কাশিতে শাঁ শাঁ শব্দ হওয়া, কোনো বিশেষ
বস্তুর সংস্পর্শে গেলে কাশি হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ
থাকতে পারে।
কাশি কত দিন ধরে হলে বিপজ্জনক রোগের লক্ষণ হিসেবে গণ্য
হতে পারে?
কাশি হতে পারে অ্যাকিউট বা আকস্মিক, ক্রনিক
বা দীর্ঘমেয়াদি। তিন সপ্তাহ বা তার অধিককাল
কাশি হলে কাশিকে বিশেষ গুরুত্ব
দিয়ে চিকিৎসা করা উচিত। মনে রাখতে হবে যক্ষ্মা,
নিউমোনিয়া, ফুসফুসের ক্যান্সার অন্যতম উপসর্গ
হলো দীর্ঘমেয়াদি কাশি। অর্থাৎ
দীর্ঘমেয়াদি কাশি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রেখে রোগ
নির্ণয়ে সচেষ্ট হতে হয়।
আবার যাদের আগে থেকেই ফুসফুসের কোনো অসুখ
আছে তাদের ক্ষেত্রে কাশি হলে তিন সপ্তাহ
দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যাদের ধূমপান করার অভ্যাস আছে বা যাঁরা ধুলাযুক্ত
পরিবেশে বসবাস বা কাজ করেন তাঁদের
কাশি হলে অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে এবং গুরুত্ব
দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। কিছু কিছু ওষুধের প্রভাবেও
কাশি হতে পারে। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য
যাঁরা এসিই ইনহিবিটর গ্রুপের ওষুধ খান তাঁদের
কাশি হলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ
করে ওষুধ পরিবর্তন করে নিতে হতে পারে।
কী লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
* দীর্ঘমেয়াদি কাশি
* কাশির সঙ্গে জ্বর ও বুকে ব্যথা
* শ্বাসকষ্ট
* কাশির সঙ্গে রক্ত বা বেশি বেশি ঘন কফ
* শরীরের ওজন কমে গেলে
* কাশির ওষুধ সেবন সত্ত্বেও কাশি না সারলে
* ঘুমের মধ্যে কাশি হলে।
যদি কাশি থাকে এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়, বুকে তীব্র
ব্যথা হয়,
তবে দেরি না করে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে।
কাশির চিকিৎসা
* সাধারণ এবং স্বল্পমেয়াদি কাশির জন্য
কাশি উপশমকারী কিছু সাধারণ ব্যবস্থা বা সাধারণ
কাশির ওষুধই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে কফের সিরাপ, গরম পানির
বাষ্প গ্রহণ, মধুমিশ্রিত হালকা গরম পানি পান উপকার
করে।
* কিন্তু কাশি যদি বিশেষ কোনো রোগের লক্ষণ
হিসেবে দেখা দেয়, তাহলে ওই রোগের জন্য নির্ধারিত
চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তিরও প্রয়োজন
হয়ে থাকে।
কাশিমুক্ত থাকার উপায়
কাশিমুক্ত থাকা আসলেই খুব কঠিন। তবে সাধারণ সর্দি-
কাশি অথবা অ্যাজমাসহ কিছু রোগে সাধারণ কিছু
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বাসস্থান ও
কর্মস্থলের পরিবেশের উন্নয়ন এবং পুষ্টিকর
খাওয়াদাওয়া করলে কাশি থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ কিছু রোগের ক্ষেত্রে বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়েও
ঝুঁকি কিছুটা এড়ানো সম্ভব।
কফ পরীক্ষা
কফ পরীক্ষা করে বহু সময় কাশির কারণ নির্ণয় করা হয়,
তবে কাশিসংক্রান্ত রোগ নির্ণয়ে রোগীর প্রদত্ত তথ্য খুব
গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- কাশি থাকলে ডাক্তারকে পরিষ্কার
করে নিচের প্রশ্নের উত্তরগুলো জানান।
* কফের সঙ্গে রক্ত যায় কি না? যদি যায়,
তবে তা কী পরিমাণে যায়?
* কাশির সঙ্গে কফ যায়? যদি যায় তবে তা কী ঘন
না পাতলা? বর্ণহীন, না কালো বা হলদেটে?
* কী পরিমাণে কফ বের হয়?
* কাশি কি হঠাৎ করে শুরু হয়, নাকি রাতে বেশি হয়?কাশির কারণে ঘুম ভেঙে যায় কি না?
* কত দিন ধরে কাশি হচ্ছে? শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কাশির প্রকোপ একই মাত্রায় আছে, না দিন দিন বাড়ছে?
* পাশ ফিরে শুইলে কি কাশির প্রকোপ বাড়ে?
* কাশির কারণে কি বমি হয়?
* কাশির কারণে কি দম বন্ধ অনুভূতি হয়?
চিকিৎসক বাড়তি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও
করাতে পারেন। এগুলোর মধ্যে আছে ব্রঙ্কোস্কোপি, বুকের
এক্স-রে, বুকের সিটিস্ক্যান, লাং স্ক্যান,
পালমোনারি ফাংশন টেস্ট (অক্সিমেট্রিসহ), কফ
অ্যানালাইসিস।
No comments:
Post a Comment